প্রতিনিধি 26 September 2026 , 9:51:58 প্রিন্ট সংস্করণ

মো. জয়নাল আবেদীন ঃ
যে তরুণদের দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল, তারা আজ অন্য দেশের উন্নয়ন ও জিডিপি বৃদ্ধিতে অবদান রাখছেন। আর বাংলাদেশ হারাচ্ছে তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদণ্ড মেধাবী মানুষ। একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার খনিজ, প্রাকৃতিক সম্পদ বা অবকাঠামো নয়; বরং তার মেধাবী মানবসম্পদ। অথচ অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিভাবান তরুণদের মধ্যে দেশ ছাড়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে না হতেই বহু মেধাবী তরুণ পাড়ি জমাচ্ছেন ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে। সংবাদমাধ্যমের ভাষায় একে বলা হয় ‘ব্রেন ড্রেন’ বা মেধা পাচার। কিন্তু এই শব্দবন্ধের আড়ালে যে গভীর জাতীয় ক্ষতি লুকিয়ে আছে, তা কেবল একটি পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি আসলে একটি রাষ্ট্রের মেধার রক্তক্ষরণ। প্রশ্ন উঠতেই পারে, তরুণরা কেন দেশ ছাড়ছেন? তবে কি দেশপ্রেমের অভাব? বাস্তবতা হলো, সমস্যাটি দেশপ্রেমের নয়; বরং দেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের। একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘ চার-পাঁচ বছর কঠোর পরিশ্রম করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পর আশা করেন, তার মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই নিয়োগে স্বচ্ছতার ঘাটতি, তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম কিংবা প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনাগুলো মেধার মূল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে অনেক ক্ষেত্রে বেতন, কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত নিরাপত্তা বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে হতাশা থেকেই জন্ম নেয় দেশ ছাড়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো- গবেষণা, উদ্ভাবন ও চিন্তার স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশের অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সীমিত গবেষণা বাজেট এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে আবদ্ধ। গবেষণাগার, আধুনিক প্রযুক্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিকমানের গবেষণা-সুবিধার অভাব একজন শিক্ষার্থীর সৃজনশীল বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। অনেক তরুণ গবেষক অনুভব করেন, যোগ্যতার তুলনায় তোষামোদ বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মূল্য বেশি। ফলে তারা এমন দেশে পাড়ি জমান, যেখানে গবেষণার স্বাধীনতা, উন্নত অবকাঠামো এবং মেধার যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তা ও তীব্র প্রতিযোগিতা অনেক শিক্ষার্থীর মনে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। বিদেশে তুলনামূলক স্থিতিশীল ক্যারিয়ার ও উন্নত গবেষণার সুযোগ তাঁদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
মেধা পাচারের আরেকটি দিক হলো দক্ষ মানবসম্পদের অপব্যবহার। আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায়, যাদের প্রকৌশল, বিজ্ঞান বা গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা, তাদের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ক্যারিয়ারের প্রতি ঝুঁকে পড়ছেন। ব্যক্তিগত পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতা অবশ্যই রয়েছে, তবে যখন গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল ধারাবাহিকভাবে অন্য খাতে সরে যায়, তখন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলো দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই মেধা পাচারের মূল্য রাষ্ট্রকে বহুমাত্রিকভাবে পরিশোধ করতে হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্প, তথ্যপ্রযুক্তি খাত কিংবা বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবায় বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। যে কাজ দক্ষ দেশীয় জনবল করতে পারত, সেই কাজের জন্য বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ শিক্ষক ও গবেষকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে একটি আত্মঘাতী চক্র- ভালো শিক্ষক ও গবেষকের অভাবে শিক্ষার মান কমছে, আর শিক্ষার মান কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্ম আরও বেশি করে বিদেশমুখী হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও স্মার্ট রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু দেশের সেরা মেধাবীরা যদি ধারাবাহিকভাবে বিদেশে স্থায়ী হয়ে যান, তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। মেধা পাচার রোধ করতে হলে শুধু আবেগ বা দেশপ্রেমের আহ্বান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর ও বাস্তবসম্মত নীতিগত উদ্যোগ। চাকরির বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, নিয়োগে মেধাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, গবেষণা ও উদ্ভাবনে জাতীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তিনির্ভর তদবির ও অস্বচ্ছ নিয়োগ সংস্কৃতির অবসান ঘটানো জরুরি।
মেধাবীরা যখন দেশ ছাড়েন, তারা শুধু একটি পাসপোর্ট বা লাগেজ নিয়ে যান না; সঙ্গে করে নিয়ে যান বাংলাদেশের ভবিষ্যতের অসংখ্য সম্ভাবনা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে যোগ্য মানুষ সম্মান, নিরাপত্তা ও কাজের যথাযথ মূল্যায়ন পাবেন। কারণ একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু সেতু, মহাসড়ক বা অট্টালিকা নির্মাণে নয়; বরং তার মেধাবী মানুষদের ধরে রাখার সক্ষমতায় নিহিত। আজ যদি আমরা আমাদের তরুণদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হই, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকলেও জ্ঞান, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বে পিছিয়ে পড়বে। আর সেই ক্ষতির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হবে আগামী প্রজন্মকেই।
এদেশে কিচ্ছু নেই। চাকরি-বাকরি নেই, উন্নত জীবন নেই, উন্নত শিক্ষা-স্বাস্থ্যব্যবস্থা নেই, সুশাসন, ন্যায়বিচার নেই, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নেই। এদেশে আছে শুধু দুর্নীতি,স্বজনপ্রীতি,মাফিয়া-ডন,কালোটাকা ও পেশীশক্তির প্রদর্শনী, স্বচ্ছতা, জবাবদিহির অভাব, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা,হয়রানি আরো কত কি! এদেশ কি দিয়েছে? এদেশ থেকে কি পেয়েছি?এ দেশকে আমি কেন ভালোবাসবো? এদেশ আমার জন্য না। এদেশের মানুষ খারাপ, কলুষিত রাজনীতি, দানবীয় ব্যবসায়ী সমাজ, টাউট-বাটপার,চোর-ডাকাতে ভরপুর।
না,এসব অভিযোগ আমার না। এই অভিযোগ, অনুযোগ এদেশের লাখো তারুণ্যের। নিদারুন মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক কষ্টে কাটানো প্রজন্মের। কেন এত শত অভিযোগ,অনুযোগ? কেন তারুণ্য দেশ ছাড়ার জন্য এতো উন্মুখ!গবেষণায় প্রতীয়মান, ২০২৩ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ৫৮টি দেশের উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছেন প্রায় ৫২৭৯৯ জন শিক্ষার্থী, ২০১৩ সালে যা ছিল ২৪১১২জন, ২০০৮ সালে ছিল ১৬৬০৯ জন।গত ১৫ বছরে মেধাপাচার তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশ ছাড়ার এই স্রোত রুখে দেওয়ার সাধ্য কার?
এ ছোট্ট একটি দেশে খুবই সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে ১৭ কোটি মানুষের চাহিদা মেটাতে হয় সরকারকে। ৪৬০ বিলিয়ন ডলারের জিডিপির এদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন । এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সরকারের প্রচেষ্টার অন্ত নেই। তবুও উন্নতজীবন ও আর্থিক নিরাপত্তার আশায় সাতসাগর তেরোনদী পাড়ি দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকাতে পাড়ি জমান। অনেকেই নিজের আত্মীয়-স্বজন পরিবার-পরিজন, প্রিয়মানুষ ছেড়ে শুধুমাত্র উন্নত সুযোগ-সুবিধা ও স্বপ্নপূরণের আশায় প্রিয় মাতৃভূমিকে ছেড়ে থাকেন।
এদেশের শ্রমবাজারে প্রতিবছর বাইশ লাখ তরুণ প্রবেশ করেন। যথোপযুক্ত কর্মসংস্থান না পেয়ে অনেকেই হতাশ হন, কষ্টে দিনাতিপাত করেন,কেউ কেউ হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা পর্যন্ত করেন। অন্যদিকে বিসিএস,ব্যাংক ও সরকারি অন্যান্য সব সেক্টর মিলিয়ে প্রতিবছর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে শূন্য পদ মাত্র ১২/১৩ হাজারের মতো। উচ্চশিক্ষিত তরুণরা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাশ করে প্রধানত চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন। একটি সোনার হরিণ চাকরি ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য তারা দিনরাত এক করে পড়াশোনা করেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরীগুলোতে গেলে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। অপরদিকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর নিয়োগে
দুর্নীতি,স্বজনপ্রীতি,অবৈধ আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তরুণ প্রজন্মের আক্ষেপ ও অভিযোগ হর হামেশাই শোনা যায়।সরকারি চাকরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে মাত্র ২৩% নিয়োগ দেয়া হয়; বাকি ৭৭ শতাংশ তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণীতে নিয়োগ পায়। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে বিগত কয়েক বছরে সে অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। বিদেশি বিনিয়োগ ও খুব একটা বাড়েনি।
পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দারিদ্র,দুর্নীতি,বিশ্বব্যাপী সমস্যা। স্বল্প সম্পদ দিয়ে বিপুল জনসংখ্যার চাহিদা পূরণে দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে। তার উপর কোভিড পরবর্তী অভিঘাত ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিও টালমাটাল। অন্যদিকে অবৈধ অর্থপাচার ও অনিয়ম-দুর্নীতির ফলে তরুণ প্রজন্মের অনেকেই বাংলাদেশে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কাগ্রস্ত।
এছাড়াও কাঙ্খিত সুযোগ-সুবিধা, অবকাঠামোগত পরিবেশের অভাবে মেধা অন্যদেশে স্থানান্তরিত হয়। ফলে দেশের অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, পরিবেশ, বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা, লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ ও নাগরিকত্বসহ স্থায়ী বসবাসসুযোগ হলো মেধাপাচারের অন্যতম কারণ।এছাড়া উন্নত বিশ্বে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে যাওয়া আরেকটি কারণ।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী প্রতি মাথাপিছু ব্যয় চার-পাঁচ লাখ, বুয়েটে ১০ লাখ ও মেডিকেলে ১৫ লাখের মতো। দরিদ্র,খেটে খাওয়া মানুষের ট্যাক্সের পয়সায় পড়াশোনা করে অভিবাসী হয়ে মনে করি এদেশ জাহান্নামে যাক।কোন দেশের থিতু হতে পারলেই নিজেকে মুই কি হনুরে মনে করি। এই দরিদ্র দেশের পয়সায় ছোট থেকে পড়াশোনা করে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে একজন বিশ্ব নাগরিক হিসেবে তৈরি করতে পারছি এটাই বা কম কিসের! উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা দক্ষ জনশক্তির একটা বিরাট অংশ দেশের বাইরে উচ্চ শিক্ষার জন্য চলে যায়।উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে যাওয়াটা দোষের কিছু না। কিন্তু তাদের মধ্যে ৮৫% ঐ সকল দেশে থিতু হতে চান।দেশ তার দক্ষ মেধা ও মননশীল শক্তিকে চিরতরে হারিয়ে ফেলে। তার মানে এদেশের তৈরি করা মেধা এদেশের ভবিষ্যতের উন্নয়নে কোন কাজেই লাগছে না। এটা দেশের জনগণের সাথে এক ধরনের প্রতারণা।
কেউ কেউ যুক্তি দিয়ে বলবেন যে রেমিট্যান্স তো পাঠাচ্ছে। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, এদেশের তৈরি করে দেওয়া দক্ষ মানবসম্পদ টোপ দিয়ে উন্নত দেশগুলো নিয়ে যাচ্ছে। সে সকল দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ব্যবহার করছে।তাহলে লাভের গুড় আসলে কে খাচ্ছে? অথচ আমাদের মত দেশগুলোতে দক্ষ জনশক্তির অভাব হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে তা আমাদের মেধাপাচারের তুলনায় কিছুই না।তাছাড়া পরিবারের একজন চলে গেলে বাকিদের সে সকল দেশে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।এ ধরনের প্রবণতা উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন অভিবাসীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। ভারতে মেট্রোরেল তৈরিতে খরচ এত কম অথচ বাংলাদেশে বেশি কেন? এক কথায় উত্তর হলো ভারতের দেশীয় প্রযুক্তি, দেশীয় দক্ষ লোকবল, দেশীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যা আমাদের নেই। আমরা অনেক কাটখড় পুড়িয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করি যার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত স্বপ্নের পদ্মাসেতু।
এফবিসিসিআই এর সাবেক সভাপতি ও বর্তমান সংসদ সদস্য এ কে আজাদ এক বক্তৃতায় বলেছেন, বাংলাদেশে চার লাখ বিদেশি দক্ষ জনশক্তি কাজ করেন। অথচ দেশের উচ্চশিক্ষিত লক্ষ লক্ষ বেকার কাঙ্খিত চাকরি খুঁজে পান না। তাহলে সমস্যা কোথায় ? সমস্যা হচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিগুলোর সাথে শিক্ষা কারিকুলামের সংযোগ খুবই কম। অর্থাৎ অনার্স, মাস্টার্স করেও কাঙ্খিত টেকনিক্যাল জ্ঞান ও সফট স্কিল অর্জন করতে আমাদের শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ হচ্ছেন। কিন্তু আমাদের অভিবাসী দক্ষ জনগোষ্ঠীর ৫০ ভাগও যদি দেশে ফিরে আসেন তাহলে অনেকাংশেই আমরা স্বনির্ভর হতে পারব । অন্তত ৪ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারব।
পাশের দেশ ভারত থেকেও প্রতিবছর উচ্চ শিক্ষার জন্য উন্নত দেশগুলোতে প্রচুর শিক্ষার্থী অভিবাসী হিসেবে প্রতিবছর উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি জমায়। তবে সরকারের শর্ত থাকে যে ডিগ্রি শেষ করে দেশে ফিরতে হবে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় উচ্চ শিক্ষাকে উৎসাহিত করা হলেও বিদেশে ডিগ্রি প্রাপ্ত কাউকে ফিরিয়ে আনার জন্য সেরকম উদ্যোগ বা প্রণোদনা দেখা যায় না। একজন অভিবাসী কম সুযোগ-সুবিধা, কম বেতনে এদেশে কেন ফিরে আসবেন!এক সমীক্ষায় দেখা গেছে,যুক্তরাষ্ট্রের ১২ শতাংশ বিজ্ঞানী, ৩৮ শতাংশ ডাক্তার ও নাসার চল্লিশ শতাংশ বিজ্ঞানী ভারতীয় বংশোদ্ভূত।
মেধাপাচার রোধে সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ, প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় যথাযথ গুরুত্বারোপ,বিদেশ ফেরত দক্ষ অভিবাসীদের যথাযথ মূল্যায়ন, মেধাবীদের বৃত্তি বা উপবৃত্তি প্রদান, সব নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার প্রাধান্য, নতুন বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি, রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশিষ্ট ও মেধাবীদের বিভিন্ন পদক-পুরস্কার ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সরকার থেকে মেধাবীদের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করতে হবে। বাংলাদেশের দ্রুত বিকশিত ও আধুনিকায়নভিত্তিক উন্নয়নের গতি অব্যাহত রাখতে মেধাপাচার রোধ গুরুত্বপূর্ণ।বিশেষজ্ঞদের মতে, মেধাপাচার রোধে সরকারকে আরো উদ্যোগী হতে হবে,কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।রাষ্ট্রকেই এর দায়িত্ব নিতে হবে।
জন এফ কেনেডি বলেছিলেন,’দেশ তোমাকে কি দিয়েছে তা জিজ্ঞেস করো না, তুমি দেশকে কি দিতে পেরেছ নিজেকে জিজ্ঞেস করো ‘।এই নিরেট সত্য, দেশাত্মবোধ,দেশপ্রেম আমাদের কয়জনের মধ্যে আছে! বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলামের কথা আমরা জানি।বিশ্বের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার ছেড়ে নিতান্তই দেশকে ভালবেসে মাত্র ৩০০০ টাকা বেতনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন।একজন স্বার্থপর, পরগাছা নাগরিকের চেয়েও দেশপ্রেমিক, নিঃস্বার্থ বাংলা মায়ের দামাল সন্তান অনেক বেশি প্রয়োজন। সারাজীবন দেশের খেয়েপরে, এদেশের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে এদেশের প্রতি দায়বদ্ধতা না রেখে তথাকথিত উন্নতদেশে চিরতরে চলে যায় তারা কি নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হন না!তাদের মনে রাখা উচিত,’জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী’।