প্রতিনিধি 20 October 2026 , 6:45:14 প্রিন্ট সংস্করণ
বরিশাল সদর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোহরার (নথিরক্ষক) পদে পুনরায় পদায়ন পাওয়াকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, ফাইল কারচুপি এবং প্রশাসনিক স্বজনপ্রীতির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। অতীতে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে বদলি হওয়া অফিস কর্মচারী মো. শাহীন হাওলাদারকে পুনরায় লাভজনক এই পদে বসাতে জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিয়ম অনুযায়ী অন্যান্য যোগ্য ও আগের আবেদনকারীদের ফাইল আটকে রেখে রহস্যজনক প্রশাসনিক বলয়ে শাহীন হাওলাদারের আবেদনটি আগে মহাপরিদর্শক নিবন্ধন (আইজিআর) কার্যালয়ে অগ্রায়ন (Forward) করা হয়েছে। একই পদে পদায়নে অন্য একাধিক মোহরার সময়মতো আবেদন জানালেও তাঁদের নথি পেছনে ফেলে বিতর্কিত এই কর্মচারীর ফাইল প্রক্রিয়াকরণ ও প্রেরণের ঘটনা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সূত্রমতে জানা গেছে, বরিশাল সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সম্প্রতি মোহরারের একটি পদ শূন্য হয়। খালি এই পদে পদায়নের জন্য চলতি মাসের শুরুর দিকেই জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে বিধিসম্মতভাবে আবেদন জমা দেন বেশ কয়েকজন আগ্রহী নথি রক্ষক। তবে অভিযুক্ত শাহীন হাওলাদারের আবেদনে তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। প্রশাসনিক বিধি ও কালানুক্রম অনুযায়ী অন্যান্য কর্মচারীদের আবেদন আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও, তা না করে নজিরবিহীনভাবে শাহীন হাওলাদারের ফাইলটি দ্রুত আইজিআর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। অভিযোগ উঠেছে, বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের প্রধান সহকারী মহাদেব চন্দ্র দাস স্বপ্রণোদিতভাবে বা কোনো বিশেষ স্বার্থে জ্যেষ্ঠতা ও পূর্বের আবেদনকারীদের তোয়াক্কা না করে শাহীন হাওলাদারের নথিটি আগে সুপারিশসহ পাঠিয়ে দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে প্রধান সহকারী মহাদেব চন্দ্র দাস তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করে জানান, “কাগজপত্র ও ফাইল পাঠানোর দায়িত্ব জেলা রেজিস্ট্রারের, প্রধান সহকারীর নয়।”
এই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা মো. শাহীন হাওলাদারের অতীত রেকর্ড পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, তিনি ইতিপূর্বে প্রায় আট বছর একটানা বরিশাল সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মোহরার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ এই কর্মকালে তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, জমি নিবন্ধনের ফাইল আটকে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি এবং বিপুল আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ব্যাপক সমালোচনার মুখে তাঁকে বাবুগঞ্জের রহমতপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর তিনি সেখান থেকে বরিশাল জেলা মহাফেজখানায় স্থানান্তর হন। বিতর্কিত অতীত থাকা সত্ত্বেও পুনরায় সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ফেরার অদম্য আগ্রহ এবং অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ফাইল আগে পাঠানোর অভিযোগের বিষয়ে শাহীন হাওলাদার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। অতীত অনিয়মের কথা কিছুটা স্বীকার করে তিনি বলেন, “মানুষমাত্রই ভুল হয়, তবে আমি এখন আর কোনো অনিয়মে জড়িত নই। কর্তৃপক্ষ বদলি না করলে আমি তো চাইলেই আসতে পারব না।” এদিকে নবনিযুক্ত বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার স্বদেশ চন্দ্র চন্দ জানান, তিনি নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন; মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকে যে নির্দেশনা আসবে সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো এবং সরকারি কর্মচারী চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারি অফিসে ফাইল প্রক্রিয়াকরণ ও আবেদনের ভিত্তিতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ‘ফার্স্ট কাম, ফার্স্ট সার্ভ’ (First Come, First Served) নীতি বা জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা অন্যতম প্রধান শর্ত। সরকারি কোনো শূন্য পদে একাধিক প্রার্থী পদায়নের আবেদন জানালে নথি অগ্রায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তারিখ ও আবেদনের ক্রম অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রায়শই রেজিস্ট্রি ফি, নকল সরবরাহ ও ঘুষ লেনদেনের বড় সুযোগ থাকায় নির্দিষ্ট কিছু ‘প্রভাবশালী’ পদের জন্য নজিরবিহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অনৈতিক ফাইল প্রক্রিয়ার অভিযোগ উঠে আসে। জ্যেষ্ঠ আবেদনকারীদের বাদ দিয়ে অতীতের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীর ফাইল দ্রুত প্রেরণের এই ঘটনা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মই নয়, বরং পুরো রেজিস্ট্রেশন বিভাগের সুশাসনের ঘাটতিকে উন্মোচিত করে।
বরিশাল সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মোহরার পদের নিয়োগ ও পদায়নে যে অনিয়মের কালো ছায়া পড়েছে, তা দূর করতে অবিলম্বে জেলা প্রশাসন ও মহাপরিদর্শক নিবন্ধন কার্যালয় থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা আবশ্যক। জ্যেষ্ঠ আবেদনকারীদের বাদ দিয়ে কেন নির্দিষ্ট এক কর্মচারীর নথি তড়িঘড়ি করে অগ্রায়ন করা হলো—তা রেজিস্টার নথি, স্মারক নম্বর ও গ্রহণের তারিখ যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোর সেবা প্রক্রিয়াকে জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে অতীতে অনিয়মে অভিযুক্তদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে পুনরায় পদায়ন বন্ধ করা এবং স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
সূত্র ঃ সংগ্রহ

















