1. nasiruddinsami@gmail.com : sadmin :
করোনার সময়েও ‘সচেতনতায়’ ভর করে চা শিল্পের উৎপাদনযাত্রা - সংবাদ সারাদেশ ২৪
শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০১:৫৭ পূর্বাহ্ন

করোনার সময়েও ‘সচেতনতায়’ ভর করে চা শিল্পের উৎপাদনযাত্রা

  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৩ মে, ২০২০
  • ১১৫ বার
সংবাদ সারাদেশ টোয়েন্টিফোর.কম ডেস্ক

:  করোনা বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতেও পিছিয়ে পড়া জীবিকায় অভ্যস্ত এক করোনা সচেতন অঞ্চল দেশের চা বাগান। সীমিত চাহিদায় জীবনধারনে অভ্যস্ত এসব চা শ্রমিকেরা খুব সহজেই মেনে চলছেন করোনা স্বাস্থ্যবিধি। করোনার এই দুর্যোগে একদিকে যেমন ‘ঘরে থাকছেন’ সচেতন মানুষ ঠিক বিপরীত দিকে রয়েছে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষেরা, সামান্য ত্রাণপ্রাপ্তিকেই উৎসবের আনন্দ মনে করছেন তাঁরা। সমাজের  বড় অন্য একটি অংশের চোখেমুখে কোনও মতে জীবনধারনের দুঃশ্চিন্তা। পর্যটন জেলা মৌলভীবাজারের প্রায় প্রতিটি উপজেলায়  যেন এক সচেতন অঞ্চল চা বাগান।

সরকার করোনার এই দুঃসময়ে দেশের অর্থনীতি যাতে ভালো থাকে এবং কোনও নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার না হয় সেজন্য স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণপূর্বক কৃষি ও শিল্পকে চালু রাখার ঘোষণা দেয়। করোনার প্রথম দিকে এ নিয়ে কেউ কেউ খেদ প্রকাশ করেন এবং অজানা আশংকার উদ্বিগ্নতার দরুন চা বাগান বন্ধ রাখার জন্য বিভিন্ন নাগরিক ও সংগঠন গণমাধ্যমে বিবৃতি প্রকাশ করে।

তবে, চা বাগানে শ্রমিকরা অনেকটা বিক্ষিপ্তভাবে কাজ করেন এবং সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার মতো যথেষ্ট সুযোগ থাকায় প্রধানমন্ত্রী  চা বাগান খোলা রাখার সিদ্ধান্তে নিজের মত প্রকাশ করেন। সাধারণ চা শ্রমিকের আপনজন ও আস্থার কেন্দ্রবিন্দু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে  পুরোদমে করোনা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়ে শুরু হয় চা বাগানে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে কাজ।
করোনার সময়েও ‘সচেতনতায়’ ভর করে চা শিল্পের উৎপাদনযাত্রা
বাংলাদেশে মূল চা বাগান রয়েছে ১৬৭টি যা, টি বোর্ডে নিবন্ধিত এবং ফাঁড়ি বাগান সহ সর্বমোট ২৪০টি, যেগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং সমতলে পঞ্চগড়, লালমনিহাটের নতুন চাষ শুরু করা বাগান নিয়ে। তন্মধ্যে মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে ৯১টি, আর চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল উপজেলায় রয়েছে ৪০টি। তবে এ হিসেবটাও খুব একটা সরলীকরণ করলে মুল ব্যাপারটি ঢাকা পড়ে যাবে। শ্রমিকদের মৌলিক সুবিধা সম্বলিত এবং চা আহরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ বা বাজারজাতকরণ যে সব বাগানে থাকে সেগুলো হলো ‘টি এস্টেট’ আর যেগুলোতে সেসব সুবিধা নেই এবং ২৫ একর ভূখন্ডের অধিক সেগুলোকে ‘চা বাগান’ হিসেবে ধরা হয়। আর নিবন্ধিত ৯৭০০০ স্থায়ী শ্রমিক ও প্রায় ৫০০০০ মৌসুমী শ্রমিক কাজ করে থাকেন এ শিল্পে। ধারণা করা যায়, প্রায় ৭ লাখ লোকের জীবন ও জীবিকার সংস্থান এ চা শিল্প।
টি বোর্ড, কলকারখানা ও প্রতিষ্টান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বিটিআরআই, ডিডিএল কার্যালয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্বাবধান ও কঠোর মনিটরিং এর মাঝেই শ্রমিক ও মালিকরা চা উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত আছেন।

এ অঞ্চলের প্রায় সবকটি ছোট – বড় বাগান মালিকেরা স্ব-ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের জন্য করোনা মোকাবেলার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারী কার্যালয়ের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণস্বাপেক্ষে শ্রমিকদের মাঝে নিয়মিত মাস্ক, সাবান এবং সুবিশাল কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রাখছেন, বিভিন্ন চা বাগানে শ্রমিকদের নন কন্ট্রাক্ট থার্মোমিটার দিয়ে প্রতিদিন শরীরের তাপমাত্রা মাপার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া, ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, অভ্যাস পরিবর্তন ও বার বার হাত ধোয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। মূলত,  চা বাগান কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের সচেতন রাখতে এবং নিয়ম মেনে চলার অভ্যাস গড়তে সমন্বিত স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করেছে যারা প্রতিনিয়ত নিজেদের চা বাগানের শ্রমিক ও অধিবাসীদের করোনা মোকাবেলায় করনীয় সম্পর্কে দিক – নির্দেশনা প্রদান করছে।

চা বাগান কর্তৃপক্ষ প্রতিটি বাগানের প্রবেশমূখে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চেকপোস্ট ও জীবানুনাশক সুরক্ষা ব্যবস্থা করেছে, গুরুতর প্রয়োজন ব্যাতীত চা বাগান পাশ্ববর্তী শহরে যেতে শ্রমিক ও কর্মচারীদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্যও একই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। অর্থাং, দুর্যোগকালীন সময়ে সম্ভাব্য সকলপ্রকার স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেই চলেছে চা বাগানের প্রাত্যাহিক কাজকর্ম। তবে সংখ্যায় খুব বেশী নয়, এমন দুয়েকটি ছোট বাগানে করোনার দুঃসময়ে, মনুষ্যসৃষ্ট হ্যাজার্ড প্রতিরোধে প্রণীত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি)পুর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট সরকারী দপ্তরগুলো।

ফলে, এখন পযন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়ে চললেও চা বাগান এলাকায় তেমনটা হয়নি। সুত্রে জানা যায়, কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর চা বাগানের শুনছড়া ফাঁড়িবাগানে একজন, শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়া চা বাগানের বাসিন্দা একজনের, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চন্ডিছড়া চা বাগানের বাসিন্দা একজন এবং কুলাউড়ার রাজকী চা বাগানের বাসিন্দা একজনের দেহে করোনা পজিটিভের সংবাদ পাওয়া গেছে। তবে তারা সবাই করোনা উপদ্রুত অঞ্চল থেকে এসেছিলেন এবং স্থানীয় সংক্রমনের কোনো নজির নেই। কোনও চা শ্রমিকও আক্রান্ত হননি। শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়া চা বাগানের আক্রান্ত হওয়া চা শ্রমিক সন্তান নারী কলেজছাত্রীকে সুস্থ্য ঘোষণা করেছে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ। শ্রীমঙ্গল উপজেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটি ও উপজেলা প্রশাসন তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সনদ প্রদান করে।

এছাড়া মৌলভীবাজার – ৪ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য উপাধ্যক্ষ মো. আব্দুস শহীদ, পিএইচডি রয়েছেন মাঠে। করোনার অভিঘাতের মধ্যেই চা শ্রমিক ও বিভিন্ন নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে সহায়তা প্রদান করেছেন। তবে, স্বাভাবিক সময়ে সংসদ সদস্যের সাথে থাকা স্থানীয় নের্তৃস্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাদের খুব একটা মানুষের মাঝে ত্রাণকার্যে চোখে পড়েনি। এক্ষেত্রে দু’একজন ব্যতিক্রম রয়েছেন। শুধু গুরুত্বপুর্ণ আলোচনায় যোগদান ও বাড়িতে থেকে পরিস্থিতি অবলোকন ও পরামর্শের কাজটুকু করছেন।

করোনার কারনে চা শ্রমিকরা কর্মহীন না হলেও, চা শ্রম জনগোষ্টি অঞ্চলের শ্রমিক পরিবারের বাসিন্দা যারা চা বাগানের বাহিরে নিম্নআয়ের কাজ করতেন, অর্থাং যারা চা শ্রমিক নয় তারা কিছুটা বেকায়দায় পড়েছেন। পরিবারের উপার্জনশীল সদস্যের হঠাৎ বেকারত্বে চাপ নিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে চা শ্রমিক পরিবারগুলো। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার মূল্যের উর্ধগতির কারনে প্রদেয় মজুরীতে কিছুতেই সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এছাড়া, রেশন তুলে যথাসময়ে তা শ্রমিকদের নিকট না পৌঁছানোরও প্রামাণিক উদাহরণ রয়েছে।

করোনার সময়েও ‘সচেতনতায়’ ভর করে চা শিল্পের উৎপাদনযাত্রাএ ব্যাপারে চা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মাখন লাল কর্মকার বলেন, ‘ চা শ্রমিকরা করোনার ঝুঁকি সত্বেও কাজ করে চলেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায়। করোনার প্রথম দিকে ‘সাধারন ছুটি আওতায় চা শিল্পকে না আনায় আমরা কিছুটা অস্বস্তিবোধ করলেও, করোনা ঝুঁকি মোকাবেলা করতে সরকারের  বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে আমাদের মনের মধ্যে থাকা উদ্বিগ্নতা দুর হয়। এই মুহুর্তে আমাদের চা শ্রমিক পরিবারের যারা বাহিরে কাজ করতো তারা বেকার হয়ে গেছে এবং প্রত্যেকটি পরিবারের সীমিত আয়ের উপর বাড়তি চাপ পড়েছে, এ অবস্থায় ত্রাণের প্রয়োজন, চাহিদামাফিক ত্রাণ পেলে চা শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকায় করোনার প্রভাব খুব একটা পড়বে বলে মনে করি না। তবে পরিস্থিতি যদি, ক্রমশ খারাপের দিকে যায় তাহলে আমাদের সে আঙ্গিকে নতুন করে চিন্তাভাবনার প্রয়োজন হতে পারে। আমাদের ভূমি অধিকার দেওয়া সময়ের দাবী। কারন, প্রধানমন্ত্রী তরুন বেকার ও কর্মহীনদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা চালু করেছেন কিন্তু নিজস্ব ভূমি না থাকার কারনে, আমাদের ছেলে – মেয়েরা জামানত দেখাতে পারবে না এবং এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে আর জামানতবিহীন হলেও একছিঁটে ভূমি বিহীন বেকার ছেলের জন্য জামিননামা দিতেও আগ্রহী ব্যক্তি পাওয়া দুষ্কর হবে, ব্যাংকও ভূমিহীনকে ঋণসুবিধা দিতে চাইবে না মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে। ফলে, আমাদের ছেলেমেয়েরা যে তিমিরে রয়েছে সে তিমিরেই থাকবে। এ দিকগুলোতে নজর দিতে হবে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী করোনার এ সময়ে সকল চা বাগানে যথাযথ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা করা হয়নি বলে দাবী করে বলেন, করোনাকালে যদিও চা বাগানে শ্রমিকরা কাজ করছেন উৎপাদনের স্বার্থে অনেকটা ঝুঁকি থাকার পরও। কিন্তু মজুরীসহ সাধারন ছুটি আমাদের দাবী।  জীবনের আগে জীবিকা নয়, চা শ্রমিকদের যেকোন পরিস্থিতিতে সুরক্ষায় ও জীবননির্বাহের জন্য সরকার ও বাগান মালিকদের পুর্বপ্রস্তুতি থাকার প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজনে এ বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে কাজ করার সাহসিকতার জন্য আর্থিক প্রণোদনা সরকার ঘোষণা করতে পারে চা- শিল্পের সাথে শ্রমিকদের জন্য।

চা জনগোষ্টির নারী নেত্রী গীতা কানু মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দুরদর্শীসম্পন্ন এবং তা সমগ্র চা শিল্পের জন্য এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত বলে আমি মনে করি। আমি এটুকু বলতে পারি, চা শ্রমিকরা অত্যন্ত সচেতন থেকে কাজ করছেন এবং স্বাস্থ্যবিধিগুলো মেনে চলছেন। আর দুর্যোগে সবকিছু শতভাগ স্বাভাবিকভাবে চলবে তা ভাবাটাও অজ্ঞানতার পরিচায়ক। দুর্যোগকে ব্যবস্থাপনা করে কিভাবে শ্রমিক – মালিক ও শিল্পকে ক্ষতির হাত থেকে যতটা সম্ভব রক্ষা করা যায় সেটাই গুরুত্বপুর্ণ। আমেরিকা বা ইতালির মতো অবস্থা হলে, এ শিল্প ও শিল্পের শিল্পীদের নিয়ে নতুন করে গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। করোনার সাথে লড়াই করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, আমাদের শ্রমিকদের করোনাকালে পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার প্রয়োজন রোগপ্রতিরোধক্ষমতা যাতে বৃদ্ধি পায় কিন্তু যা মজুরী তা দিয়ে একটি শ্রমিক পরিবারের নিম্নতম চাহিদা কোনোভাবেই মিটে না। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের শ্রমিকরা কাজ করছে এবং আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। এছাড়া, চা শ্রমিকদের নিবন্ধনকৃত ট্রেড ইউনিয়ন  হলো বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন, চা শ্রমিকের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আমরা দেখে থাকি,   মহল বিশেষের নিজেদের অপকৌশল চা শিল্পের জন্য অশনি সংকেত এবং তারা এ শিল্পকে অশান্ত করার পায়তারা করে থাকে বিভিন্নভাবে। করোনার এই দুঃসময়ে আমরা সবকিছু নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।

ইস্পাহানি মির্জাপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো.সাইদুজ্জামান ও সাতগাঁও চা বাগান ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম জানান, তাদের বাগানগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রমিকরা কাজ করছে। সামাজিক ও শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখতে বাগানগুলোতে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক টিম রয়েছে যারা শ্রমিকদের এসব বিষয়ে সহায়তা করে থাকে। শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে সাবান ও পানি, মাস্ক প্রদান করা হচ্ছে এবং করোনা মোকাবেলায় তারা সচেতন রয়েছেন এবং প্রেষণার মাধ্যমে শ্রমিকদের করোনাকালে মানসিকভাবে উজ্জীবিত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

করোনা সাবধানতার কারনে সাধারণ চা শ্রমিকের সরেজমিনে বক্তব্য গ্রহণ না করে, মুঠোফোনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চা শ্রমিক জানান, ‘আমরা যারা চা বাগানে মাঠে কাজ করছি তাদের মাঠেই পাতি তোলার কাজ করানো হচ্ছে, কারখানায় যারা কাজ করছে তাদের কারখানায়ই। বাংলো, কোয়ার্টারে যারা কাজ করছি তাদেরও অদল – বদল করা হচ্ছে না এই করোনার সময়ে। অন্যান্য সময় যেকোন দিন কোম্পানী কাজ বদলে দিতেন কিন্তু এ সময় যে যে কাজে আছে তাকে সে কাজে নিযুক্ত রাখা হচ্ছে। সাহেব, বাবু, সরদার (সুপারভাইজার) ও ছুকরা (তরুন) স্বেচ্ছাসেবীর সহায়তায় আমরা নিয়ম মেনে কাজ করছি এবং মজুরী ও রেশন পাচ্ছি। আমাদের অনুরোধ থাকবে, বাগানগুলোতে মালিকের ব্যবস্থাপনায় সন্দেহজনক ব্যক্তির জন্য আলাদা ‘করোনা ঘর’ (ফ্যাসিলেটিজ কোয়ারেন্টিন) তৈরী করে রাখা কারো লক্ষণ দেখা গেলে তাকে যেন নিজের ঘরে না রেখে ওখানে রাখা হয় এবং খাবার দেওয়া হয়।’

করোনা ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটি (মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা) অন্যতম সদস্য মৌলভীবাজার জেলা শ্রমিক লীগ সাধারণ সম্পাদক নেতা জাকারিয়া ও বালিশিরা পশ্চিমাঞ্চলের ভ্যালি সভাপতি ও মৌলভীবাজার জেলা শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক চা বাগান কর্মচারী সুরঞ্জিত দাশ জানান, করোনার এই পরিস্থিতিতে সরকার – মালিক- শ্রমিক সবাইকে এক প্লাটফর্মে থেকে দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হবে। চা কৃষিজ ও পঁচনশীল পণ্য এবং যেহেতু এটিকে বাগান বলা হয় সুতরাং বাগানের নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন, এর ব্যাত্যয় ঘটলে যে ক্ষতি হবে তা সহজে উঠিয়ে আনা সম্ভব নয়। চা শিল্পের  পুরোটাই প্রকৃতি ও সময় নির্ভর। সময়ের কাজ অসময়ে করার কোনো সুযোগই নেই। আমরা চা বাগানের কর্মচারীরা বাগানে থেকে কোভিড – ১৯ সম্পর্কিত স্বাস্থ্যসচেতনতা মেনে কাজ করছি এবং প্রথমদিকে একটু উৎকন্ঠা থাকলে এখন আর তা নেই।

বাংলাদেশ টি এস্টেট স্টাফ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘করোনাকালে
কর্মচারীদের মজুরী/বেতন প্রদান করা হচ্ছে। আমরা স্টাফদের জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বাগানের বাইরে যেতে নিরুৎসাহিত করছি। অফিস – কারখানা সর্বত্র পারসোনাল হাইজিন মেনে কাজ করছেন সহকর্মীরা চা শিল্পের উন্নতির স্বার্থে। আশাকরি আমরা এভাবেই করোনাকে জয় করতে পারবো।

ফিনলে চা কোম্পানীর ডিজিএম ও বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট ব্রাঞ্চ চেয়ারম্যান জি. এম. শিবলী ইমেইল বার্তায় জানান, কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে শ্রমিকরা কর্মরত অবস্থায় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চা পাতা চয়নের কাজ করছে এবং অন্যান্য সবধরনের কাজ করার সময়ও চা বাগানের শ্রমিকরা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছে। বাইরে থেকে কাউকে বাগানে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না আবার বাগানের লোকজনদের বাইরে যেতেও সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। আমরা এ বছর চা উৎপাদনে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছি আবহাওয়া অনুকুল না থাকার কারনে। সামনের দিনগুলোতে এ আশা করি এ অবস্থা থেকে সবাই মিলে উত্তরণ ঘটাতে পারবো।

চা বোর্ডের প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিটের পরিচালক ড. রফিকুল হক জানান, তারা প্রত্যেক চা বাগানের মালিকদের ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন শ্রমিকদের মাস্ক বিতরণ এবং হাত ধোয়ার বিষয়ে সচেতন করতে। একই সাথে বাগানে কোন প্রবাসী থাকলে তাদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে এবং সবসময় করোনা বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে। আর করোনা সচেতনায় সরকারের নির্দেশনা যেন তারা অবশ্যই পালন করেন।

শ্রীমঙ্গলস্থ বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উপ -পরিচালক কার্যালয়ের পরিচালক নাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে যাতে কোনো অসন্তোষের সৃষ্টি না হয় বা অহেতুক উদ্বেগ – উৎকন্ঠা কেউ সৃষ্টি করতে না পারে সেসব বিষয়ে আমরা শ্রমিক ও মালিকপক্ষের সাথে আলোচনা করছি এবং এ শিল্প সংশ্লিষ্ট সবার জীবন ও জীবিকা রক্ষায় পারষ্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে করোনার এ দুঃসময়ের দিনগুলো ধৈর্য্যসহকারে নিয়ম মেনে পার করার জন্য অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছি। বর্তমানে কোনো বাগান লে – অফ করেনি।

কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর শ্রীমঙ্গলের উপমহাপরিদর্শক মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘আমরা করোনাকালে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে এবং মোবাইলে বাগান ব্যবস্থাপক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রাখছি, মনিটরিং করছি সবকিছু। এই মুহুর্তে এ অঞ্চলের প্রায় সবকটি চা বাগানই মোটামোটিভাবে নির্দেশনাগুলো পালন করছেন এবং বাকিদেরও আমরা নির্ধারিত মানে পৌঁছানোর ব্যাপারে কাজ করছি।
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) পরিচালক ড. মোহাম্মদ আলী জানান, ‘বাগান ব্যবস্থাপকদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। চা গাছের বা মাটির যেকোন প্রয়োজনে আমরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অবগত হই এবং সমাধান প্রদান করতে সচেষ্ট থাকি। বৃষ্টি যথাসময়ে না হওয়ায়, এ বছর প্রথম দিকে চা গাছগুলোকে কৃত্রিম সেচের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখতে হয়েছে। তবে আশার কথা, এ বছর এখন পর্যন্ত চা বাগানগুলোতে কীট –পতঙ্গের আক্রমণ ততটা লক্ষনীয় নয় ফলে যথারীতি স্বাভাবিকভাবে কাজ চললে এবং কীটনাশক যথাসময়ে ছিটানো হলে চায়ের ভালো উৎপাদন হবে বলে আশা করি।
অপরদিকে, সামাজিক দুরত্ব নির্বাহে চলমান ২০২০-২১ অর্থবছরের ১ম চা নিলাম চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে ভেন্যু পরিবর্তন করে গেলো সোমবার অনুষ্টিত হয়েছে। আর শ্রীমঙ্গল চা নিলাম কেন্দ্রের জন্য মাসে নির্ধারিত দুটি পুনরায় চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে সংযুক্তি করা হয়েছে এবং শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্রকে দুটি বিশেষ নিলাম কা কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে বলে জানালেন টি প্লান্টার্স এন্ড ট্রেডার্স এসোসিয়েশনের (টিপিটিএবি) সদস্য সচিব জহর তরফদার।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, এছাড়া করোনা দুর্যোগে চা বাগানগুলোতে সরকারী তরফ থেকে চাল সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে, ইতিমধ্যে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ২২টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শুধু চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য বিশেষ নগদ অর্থসাহায্য দেওয়া হচ্ছে, যেগুলোর তালিকা অনুযায়ী চেক ইতোমধ্যে বিতরণের জন্য প্রায় প্রস্তুত, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির আওতায় সুবিধাভোগী চা জনগোষ্টি অঞ্চলের অধিবাসী প্রাক্তন চা শ্রমিক ও বয়স্ক, বিধবাভাতা ইত্যাদি একটি বেসরকারী ব্যাংকের মাধ্যমে জিটুপি পদ্ধতিতে ভাতা প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এছাড়া, চা শ্রমিক, চা শিল্প জনগোষ্টি এলাকার অধিবাসী ও চা শিল্পের যেকোন প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসন নিয়মানুযায়ী সর্বাত্বক সহযোগীতা প্রদান করবে।
এছাড়া, কোনও কোনও বাগান কর্তৃপক্ষ বলছে, করোনার কারনে নিলাম বন্ধ থাকায় চা অবিক্রিত থেকে গেছে, ফলে মিলছে না চা বিক্রির বকেয়া টাকা। চায়ের গড় দাম কম পাওয়ায়, উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি এমন দাবী করছেন চা বাগান মালিকরা। করোনার এ পরিস্থিতির জন্য সহায়তা চান বাগান মালিকেরা।

 

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2023 SangbadSaraDesh24.Com
Theme Customized By BreakingNews